নিজস্ব প্রতিবেদক: আমানতকারীদের জন্য বিপদজনক হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে যমুনা ব্যাংক পিএলসি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটির আমানতকারীদের অর্থ দিনকে দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ, যা দেখে হতবাক ও হতাশ হয়েছেন আমানতকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, যেকোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যদি মোট ঋণের ৫ শতাংশ বা তার বেশি হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের ডিপোজিট বা আমানত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। অর্থাৎ সেই ব্যাংকে থাকা আমানত সঠিক সময়ে আমানতকারীরা ফেরত না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
পাঁচটি দুর্বল শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি সেগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত করে, যার নতুন নাম দেওয়া হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এতে করে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা তাদের আমানত ফিরে পেতে নানা রকম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। সেই সাথে ব্যাংকগুলোর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় উঠে এসেছে বিনিয়োগকারীদের নামও। ফলে নতুন করে আর কোনো ব্যাংক দেউলিয়া বা খেলাপি ঋণের বেড়াজালে পড়ুক তা কেউই চায় না। এমন পরিস্থিতিতে যমুনা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়াকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টারা।
(যমুনা ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে আট পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালনা ও পরিচালকদের অনিয়ম নিয়ে প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
যমুনা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩০৭ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৯২৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩৮১ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির সমন্বিতভাবে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ১৪ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার ৬০২ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭ শতাংশ খেলাপি পর্যায়ে রয়েছে, যা আমানতকারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, যমুনা ব্যাংক পুঁজিবাজারের বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে ৩৫০ কোটি ২২ লাখ ৩৪ হাজার ১৮৭ টাকা বিনিয়োগ করেছিল, যার মধ্যে খেলাপি ঋণে জর্জরিত এক্সিম ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ারের নামও রয়েছে। বর্তমান এই বিনিয়োগের বাজার মুল্যের (মার্কেট ভ্যালু) পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৩৪৮ কোটি ৭১ লাখ এক হাজার ১৩৫ টাকা। এক্ষেত্রে ব্যাংকের আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে এক কোটি ৫১ লাখ ৩৩ হাজার ৫২ টাকা। অর্থাৎ এই আনরিয়েলাইজড লোকসান মূলত ব্যাংকটির বিনিয়োগকারীদের লোকসান।

কোম্পানি সূ্ত্রে জানা গেছে, যমুনা ব্যাংকের ২০২৪ সালে নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম ছিল ৩৩৭ কোটি ৯৩ লাখ ২৭ হাজার ২২৩ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৪৪১ কোটি ৮২ লাখ ৬২ হাজার ৫৭৯ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির নিট ইন্টারেস্ট কমেছে ১০৩ কোটি ৮৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫৬ টাকা বা ২৪ শতাংশ।

এসব ব্যাপারে জানতে যমুনা ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল কানন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি প্রশ্নসমূহের উত্তর দিতে রাজধানীর গুলশানে দেখা করতে বলেন। এরপর শেয়ারবাজার বিডির এই প্রতিবেদক তার সাথে গুলশানে দেখা করতে গেলে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, যমুনা ব্যাংক আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তাদের ঋণ খেলাপি কোন পর্যায়ে রয়েছে তা আমরা দেখভাল করছি।
উল্লেখ্য, যমুনা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৯৩৯ কোটি ৩৩ লাখ ৭ হাজার টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ৯৩ কোটি ৯৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬৩০টি, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৫৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৪০ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে দশমিক ১৩ শতাংশ।



















