শেয়ারবাজার বিডি রিপোর্ট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে নিজেদের অনুমোদিত বা সার্টিফায়েড আর্থিক পরামর্শদাতা পরিচয় দিয়ে ‘ঝুঁকিহীন আয়ের’ প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, অল্প সময়ে, এমনকি দুই সপ্তাহের মধ্যেই বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের আশ্বাস দিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রতারণা ও বাজার কারসাজি ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভাজন আর্থিক মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই ভবনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। কোনো শেয়ারের দামে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সঠিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত আর্থিক বিশ্লেষকদের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে হবে। বাজারের বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে তারা তা জনসমক্ষে তুলে ধরলে বিনিয়োগকারীরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে পুরো পুঁজিবাজারও আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও স্বচ্ছ হবে।
পুঁজিবাজারে কারসাজিকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে মমিনুল ইসলাম বলেন, বিশেষ করে তথ্যের ঘাটতি থাকলে কিংবা কোনো পক্ষ ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই নিবন্ধিত আর্থিক বিশ্লেষক ও অন্যান্য পেশাদার বাজার অংশগ্রহণকারীদের আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারে আরও ভালো ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণকারী প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিনিয়োগ পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, বন্ড মার্কেটকে আরও কার্যকর করা এবং নতুন ইস্যু, আইপিওসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ পণ্যের মাধ্যমে বাজারকে আরও গভীর ও কার্যকর করতে হবে।
পুঁজিবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মূল্য নির্ধারণ ও প্রাইসিং প্রক্রিয়ার কথা তুলে ধরেন ডিএসই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, একজন ইস্যুয়ার কীভাবে বাজারে আসবেন, কীভাবে তার মূল্য নির্ধারণ হবে এবং বাজারে আসার পর তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, এসব বিষয় আরও কার্যকরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
বর্তমানে স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার ও এআইয়ের প্রসারের কারণে তথ্য আদান-প্রদান অনেক সহজ হয়েছে উল্লেখ করে মমিনুল ইসলাম বলেন, এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। আগে যেভাবে বাজার কারসাজি করা হতো, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
তিনি জানান, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গ্রুপ তৈরি করে কিছু ব্যক্তি নিজেদের সার্টিফায়েড বা অনুমোদিত আর্থিক পরামর্শদাতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তারা সাধারণ মানুষকে এমন ধারণা দিচ্ছেন যে অল্প সময়ে, এমনকি দুই সপ্তাহের মধ্যেই বড় অঙ্কের অর্থ আয় করা সম্ভব এবং এতে কোনো ঝুঁকি নেই।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, এ ধরনের প্রলোভনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে গত বছর বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু গ্রুপ ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মূল অংশে রয়েছে ব্রোকার, বিনিয়োগকারী, ইস্যুয়ার, স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে এখন এর বাইরেও নজর দিতে হবে। প্রযুক্তি ও এআই কীভাবে পুঁজিবাজারের পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে, তা বুঝতে হবে এবং একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজার কারসাজি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে হবে।
এআই ব্যবহার করে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড শনাক্ত, তথ্য বিশ্লেষণ এবং যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করছেন তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব বলেও জানান তিনি। সঠিক তথ্য, উপযুক্ত কীওয়ার্ড ও নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড শনাক্তের সুযোগ রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। পুঁজিবাজারে শক্তিশালী ও সুনামসম্পন্ন মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারির সংখ্যা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল আর্থিক মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রোকার, ফান্ড ম্যানেজার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার ও মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজারদের এমন অবস্থানে যেতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, সামনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত আর্থিক মধ্যস্থতাকারী বা ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারমিডিয়ারি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। মানুষ যেন সঠিক জায়গা থেকে বিনিয়োগের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সেবা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সংস্কার নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করছেন। গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম সরকার পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সংস্কারের বিষয়টিকে এতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বাজেট বক্তৃতাতেও এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, স্থিতিস্থাপক ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এজন্য বাজারের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে মমিনুল ইসলাম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ইস্যুয়ার, ব্রোকার ও বিনিয়োগকারীসহ সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা সম্ভব।
শেয়ারবাজার বিডি



















