শেয়ারবাজার বিডি রিপোর্ট: ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি ব্যবস্থার দিকে এগোতে চায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর অংশ হিসেবে দেশের সব ব্রোকারেজ হাউজের জন্য একটি ইউনিফাইড ও অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
তিনি বলেছেন, ডিজিটাল যুগে ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংক হিসাব এবং সিসিএ (কাস্টমার ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট) হিসাবে থাকা অর্থের রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে প্রতিদিন অর্থের পুনর্মিলন (রিকনসিলিয়েশন) করা সম্ভব হবে এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থে কোনো ঘাটতি বা অনিয়ম হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আয়োজিত ‘আইপিএফ তহবিল বিতরণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে’ এসব কথা বলেন তিনি। ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অর্থ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, পাঁচটি সিকিউরিটিজ হাউজে ৪৯২ কোটি টাকার আর্থিক অস্বচ্ছতার ঘটনায় ১৭ হাজার ৯৬৭ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন ছিল। আজকের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই সমাধান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, যে সমাধানের কার্যক্রম আজ দেখা যাচ্ছে, এটি ডিএসইর কোনো একক অর্জন নয়। একইভাবে এটি বিএসইসির একক কৃতিত্বও নয়, এমনকি ইনভেস্টরস ফোরামেরও একক কৃতিত্ব নয়। বরং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এ পর্যায়ে আসা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, এই টিমওয়ার্ক না থাকলে হয়তো আজকের অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা সম্ভব হতো না।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, ডিএসইর পক্ষ থেকে কমিশনের কাছে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বিএসইসি তা পূরণ করেছে। একই সঙ্গে ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) নিয়ে দ্রুত কাজ করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
আইপিএফের উদ্দেশ্য তুলে ধরে মাসুদ খান বলেন, তহবিলটি মূলত সেটেলমেন্ট ঝুঁকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বিনিয়োগ করা অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা সামনে আসায় এই তহবিলের ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা ভিন্নভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
তিনি বলেন, যারা আস্থা রেখে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অন্য কোনো দেশে এত বড় পরিসরে ঘটে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, ডিএসইর সঙ্গে ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মাসুদ খান বলেন, এমন একটি ইউনিফাইড ব্যাক অফিস সফটওয়্যার প্রয়োজন, যা অত্যন্ত সুরক্ষিত হবে এবং ব্রোকারদের রিয়েল-টাইম তথ্য সরবরাহ করবে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন পুরো রিকনসিলিয়েশন দেখা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংক হিসাবে কত টাকা রয়েছে এবং সিসিএ অ্যাকাউন্টে কত টাকা রয়েছে—সেই তথ্য নিয়মিতভাবে যাচাই করা জরুরি। এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা গেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি তদারকির ওপর চাপও কমবে।
এর পাশাপাশি অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওএমএস) নিয়েও এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই ডিজিটাল যুগে আমাদের এটাকে অবশ্যই করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
এদিকে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কঠিন জীবনযাপন করছেন। এ ধরনের ঘটনা পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা তৈরির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যেন পুঁজিবাজারের ওপর তাদের আস্থা পুনরায় ফিরে পান, সে লক্ষ্যে বিএসইসি কাজ করবে।
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, আইপিএফের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সব বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে ৫ লাখ টাকার নিচে পাওনা থাকা বিনিয়োগকারীদের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশের পাওনা ৫ লাখ টাকার নিচে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের পাওনা পুরোপুরি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ৫ লাখ টাকার বেশি পাওনা থাকা বিনিয়োগকারীদেরও ধাপে ধাপে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
মাসুদ খান বলেন, আপাতত ৫ লাখ টাকার নিচে যাদের পাওনা রয়েছে, তাদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে শেষ পর্যন্ত সবাইকে এই অর্থ ফেরত কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।
শেয়ারবাজার বিডি



















